০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাঞ্ছারামপুরে বাণিজ্য মেলায় উপচে পড়া ভীড়

জহির শাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
  • Update Time : ১০:৫৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৩৬ Time View

 

জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি | ১৭ নভেম্বর ২০২৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে এ বছর যে মাসব্যাপী শিল্পপণ্য ও বাণিজ্য মেলা চলছে, তা যেন শুধু বাণিজ্যের আঙিনা নয় — এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনরঙের এক জমাট প্রদর্শনী। পৌরসভার ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন মাঠে নেক্সুরা ট্রেডিং কর্পোরেশনের আয়োজনে ১ নভেম্বর শুরু হওয়া এই মেলায় প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামছে; শুক্র-শনিবার সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ মনে হয়, যেন কোনো প্রাচীন সভ্যতার উৎসবে সময়চক্র ভেঙে উপস্থিত হয়ে পড়েছি। সরেজমিনে দেখা যায়, হোমনা, তিতাস, মেঘনা, নবীনগর, মুরাদনগর, আড়াইহাজার ও মাধবদীর মানুষ এক অদ্ভুত টানেই ছুটে আসছেন — ঠিক যেমন মানুষ মোগল আমলে হাট-বাজারে জড়ো হতো, যেখানে বাণিজ্যের সাথে মিলেমিশে থাকত গল্প-সংস্কৃতি-মানুষের হাহাকার আর হাসি। প্রতিদিন লাখো টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে, আর প্রতিটি স্টলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, বাজার নয়, যেন যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা মানুষের বিনিময়যজ্ঞ।

আয়োজক মীর মোশাররফ হোসেন বকুল জানালেন, বিভিন্ন জেলা থেকে ৭০টি স্টল ও চারটি প্যাভিলিয়ন অংশ নিচ্ছে—নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, ফার্নিচার, পোশাক, প্রসাধনী—সব মিলিয়ে যেন এক আধুনিক বণিকসমাজের প্রতিচ্ছবি। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ড্রাগন ট্রেন, নৌকা, গেম জোন—এগুলো দেখে মনে হয়, ঐতিহাসিক মেলা সংস্কৃতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে নবায়ন করে। আর খাবারের স্টলগুলো—ফুচকা, চটপটি, তান্দুরি চা—এগুলো তো সরাসরি স্থানীয় স্বাদ-সংস্কৃতির জীবন্ত ফসিল, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের আড্ডার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।

শনিবার (১৫ নভেম্বর) মেলাভবন ঘুরে দেখা গেল—কিছু স্টলে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ভিড় শুধু কেনাকাটার জন্য নয়; এটা মানুষের মনোজগতে মেলার প্রতি বহুদিনের টান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মেলা ঘুরে দেখা—যা বাঙালি সমাজে বারবার ফিরে আসে। শীত উপেক্ষা করে সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে মানুষের ভিড় দেখে মনে হয়—যে সমাজে দিনযাপন কঠিন, সেখানে মেলা মানে একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ, একটু স্মৃতির আশ্রয়।

শীতের পোশাক, গৃহস্থালী সামগ্রী, খেলনা, নারীদের পণ্য—সব স্টলে প্রচণ্ড ভিড়। ইলেকট্রনিক্স, প্লাস্টিকের সামগ্রী, রান্নার পণ্য—সবই রয়েছে বাণিজ্য ইতিহাসের আধুনিক রূপ। ব্লেজার বিক্রির ছোট স্টলে গিয়ে দেখা যায়—মানুষ ঠাসাঠাসি, ঠিক যেন প্রাচীন বাজারের মতো। বিক্রয়কর্মীদের ব্যস্ততা দেখে চেনা যায়—যে মেলা এখনও মানুষের কাছে আনন্দ-উৎসবের স্মারক।

পরিবার নিয়ে আসা হোমনার মামুন বললেন—বাচ্চাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য আসা; নবীনগরের শিক্ষক সালমা বেগম জানালেন—পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখা আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা; কলেজছাত্র আসিফের কাছে মেলা মানে—বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটা, আড্ডা, হাসাহাসি। এটাই তো মেলা—সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মিলনমাঠ।

বিক্রেতারাও খুশি। আবদুর রহমান বললেন—শুক্র-শনিবার মানুষ বেশি আসবেই; কিন্তু এবার ভিড় প্রত্যাশারও বাইরে। খেলনা বিক্রেতা জহির আহমেদ বললেন—মেলার সৌন্দর্যই হলো মানুষ। আর এই উপস্থিতি প্রমাণ করে—বাণিজ্য মেলা শুধু বেচাকেনার আয়োজন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে।

দর্শনার্থী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মেলা স্থানীয় অর্থনীতিতে যেমন গতি আনবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাঙালি সংস্কৃতির চলমান ধারাকেও জীবন্ত রাখবে—একদিকে আধুনিক বাণিজ্যের দাপট, অন্যদিকে শেকড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গন্ধ—দুটোই এই মেলায় পাশাপাশি হাঁটে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

বাঞ্ছারামপুরে বাণিজ্য মেলায় উপচে পড়া ভীড়

Update Time : ১০:৫৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

 

জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি | ১৭ নভেম্বর ২০২৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে এ বছর যে মাসব্যাপী শিল্পপণ্য ও বাণিজ্য মেলা চলছে, তা যেন শুধু বাণিজ্যের আঙিনা নয় — এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনরঙের এক জমাট প্রদর্শনী। পৌরসভার ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন মাঠে নেক্সুরা ট্রেডিং কর্পোরেশনের আয়োজনে ১ নভেম্বর শুরু হওয়া এই মেলায় প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামছে; শুক্র-শনিবার সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ মনে হয়, যেন কোনো প্রাচীন সভ্যতার উৎসবে সময়চক্র ভেঙে উপস্থিত হয়ে পড়েছি। সরেজমিনে দেখা যায়, হোমনা, তিতাস, মেঘনা, নবীনগর, মুরাদনগর, আড়াইহাজার ও মাধবদীর মানুষ এক অদ্ভুত টানেই ছুটে আসছেন — ঠিক যেমন মানুষ মোগল আমলে হাট-বাজারে জড়ো হতো, যেখানে বাণিজ্যের সাথে মিলেমিশে থাকত গল্প-সংস্কৃতি-মানুষের হাহাকার আর হাসি। প্রতিদিন লাখো টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে, আর প্রতিটি স্টলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, বাজার নয়, যেন যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা মানুষের বিনিময়যজ্ঞ।

আয়োজক মীর মোশাররফ হোসেন বকুল জানালেন, বিভিন্ন জেলা থেকে ৭০টি স্টল ও চারটি প্যাভিলিয়ন অংশ নিচ্ছে—নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, ফার্নিচার, পোশাক, প্রসাধনী—সব মিলিয়ে যেন এক আধুনিক বণিকসমাজের প্রতিচ্ছবি। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ড্রাগন ট্রেন, নৌকা, গেম জোন—এগুলো দেখে মনে হয়, ঐতিহাসিক মেলা সংস্কৃতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে নবায়ন করে। আর খাবারের স্টলগুলো—ফুচকা, চটপটি, তান্দুরি চা—এগুলো তো সরাসরি স্থানীয় স্বাদ-সংস্কৃতির জীবন্ত ফসিল, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের আড্ডার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।

শনিবার (১৫ নভেম্বর) মেলাভবন ঘুরে দেখা গেল—কিছু স্টলে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ভিড় শুধু কেনাকাটার জন্য নয়; এটা মানুষের মনোজগতে মেলার প্রতি বহুদিনের টান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মেলা ঘুরে দেখা—যা বাঙালি সমাজে বারবার ফিরে আসে। শীত উপেক্ষা করে সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে মানুষের ভিড় দেখে মনে হয়—যে সমাজে দিনযাপন কঠিন, সেখানে মেলা মানে একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ, একটু স্মৃতির আশ্রয়।

শীতের পোশাক, গৃহস্থালী সামগ্রী, খেলনা, নারীদের পণ্য—সব স্টলে প্রচণ্ড ভিড়। ইলেকট্রনিক্স, প্লাস্টিকের সামগ্রী, রান্নার পণ্য—সবই রয়েছে বাণিজ্য ইতিহাসের আধুনিক রূপ। ব্লেজার বিক্রির ছোট স্টলে গিয়ে দেখা যায়—মানুষ ঠাসাঠাসি, ঠিক যেন প্রাচীন বাজারের মতো। বিক্রয়কর্মীদের ব্যস্ততা দেখে চেনা যায়—যে মেলা এখনও মানুষের কাছে আনন্দ-উৎসবের স্মারক।

পরিবার নিয়ে আসা হোমনার মামুন বললেন—বাচ্চাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য আসা; নবীনগরের শিক্ষক সালমা বেগম জানালেন—পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখা আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা; কলেজছাত্র আসিফের কাছে মেলা মানে—বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটা, আড্ডা, হাসাহাসি। এটাই তো মেলা—সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মিলনমাঠ।

বিক্রেতারাও খুশি। আবদুর রহমান বললেন—শুক্র-শনিবার মানুষ বেশি আসবেই; কিন্তু এবার ভিড় প্রত্যাশারও বাইরে। খেলনা বিক্রেতা জহির আহমেদ বললেন—মেলার সৌন্দর্যই হলো মানুষ। আর এই উপস্থিতি প্রমাণ করে—বাণিজ্য মেলা শুধু বেচাকেনার আয়োজন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে।

দর্শনার্থী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মেলা স্থানীয় অর্থনীতিতে যেমন গতি আনবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাঙালি সংস্কৃতির চলমান ধারাকেও জীবন্ত রাখবে—একদিকে আধুনিক বাণিজ্যের দাপট, অন্যদিকে শেকড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গন্ধ—দুটোই এই মেলায় পাশাপাশি হাঁটে।