০১:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রাম বিভাগে অর্ধলাখ শিশু এখনো শিক্ষার বাইরে: হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক

জহির শাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
  • Update Time : ০১:০১:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
  • / ৭৩ Time View

 

জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি | ৯ নভেম্বর ২০২৫

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় এখনো প্রায় অর্ধলাখ শিশু কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই তথ্য। অধিদপ্তর বলছে, বিদ্যালয়ের সীমিত সংখ্যা, আর্থিক অক্ষমতা ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বহু শিশুই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকছে।

জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী মোট ৪৬ হাজার ৪৬৪ শিশু কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়নি। এদের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি — ৩৫ শতাংশেরও বেশি শিশু — রয়েছে হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। সংখ্যা হিসেবে যা প্রায় ১৬ হাজার ৩৫৩ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে নোয়াখালী (৬,৭৫৯ জন) এবং চট্টগ্রাম জেলা (৫,৭৫০ জন)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবারের আয় হ্রাস শিক্ষাক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বহু শিশু বিদ্যালয়ের পরিবর্তে পরিবারের জীবিকার অংশ হয়ে পড়ছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বিদ্যালয়ে শিশুভর্তির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২০ সালের তুলনায় এখন শিশুভর্তির হার অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ের আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস শিশুদের বিদ্যালয় বিমুখ করছে।

হাওরের কারণে পিছিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বণিক বলেন, “হাওর এলাকায় দীর্ঘ সময় পানিবন্দি থাকার কারণে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি এবং ভর্তি—দুটিই ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নাসিরনগরের দুই ইউনিয়ন প্রায় বছরজুড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার সুষ্ঠু কার্যক্রম চালানো কঠিন।”

তিনি জানান, জেলায় হাওরাঞ্চলে অবস্থিত ২২টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে পারে না। “এই অবস্থায় বিকল্প শিক্ষা উদ্যোগ—যেমন মোবাইল স্কুল বা স্যাটেলাইট ক্লাসরুম চালু করা না গেলে শতভাগ ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়,” বলেন তিনি।

অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আতাউর রহমান জানান, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনতে স্যাটেলাইট স্কুল, অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র ও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রতিটি শিশুই অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত বিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে অংশ নিক। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।”

চট্টগ্রাম শহরের বাস্তবতা
চট্টগ্রামের উপকূল ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও শিক্ষাবিমুখতার চিত্র উদ্বেগজনক। নগরীর কর্ণফুলী নদীপাড়ের শুকনো মাছ পল্লীতে কাজ করে ১২ বছর বয়সী মোকলেস। কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে আসা এই কিশোরের পরিবারের পক্ষে তার বিদ্যালয়ে পাঠানোর সামর্থ্য নেই। সে এখন মাসে সাত হাজার টাকায় শ্রম বিক্রি করছে।

কালুরঘাট এলাকার খাবারের দোকানে কাজ করছে ১০ বছরের সুমন মিয়া। তার বাবা বলেন, “পেটে ভাত দিতে পারলেই কৃতজ্ঞ থাকি, স্কুলের চিন্তা করার অবকাশ নেই।”

সংখ্যার পেছনের চিত্র
চট্টগ্রাম বিভাগের ১১০টি উপজেলায় মোট বিদ্যালয়গম্য শিশুর সংখ্যা ৪০ লাখ ৫৪ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার ৯৭৮ জন — ভর্তির হার ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে ৫৯ হাজার ৯২৮ শিশু ভর্তি হয়েও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে, যার হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু রয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় (৩,২৯৮ জন), আর সবচেয়ে কম রাঙ্গামাটিতে (১৫২ জন)।

শিক্ষাবিদদের মতামত
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার শুধু সরকারি উদ্যোগে নয়, বরং সমাজের সচেতনতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহযোগিতাতেও নির্ভরশীল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত শিক্ষাকে শুধুই আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘জীবনযাত্রা-নির্ভর শিক্ষা’ হিসেবে দেখা। পরিবারগুলোকে বোঝাতে হবে— বিদ্যালয় শিশুদের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী বছর থেকেই হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে “ভাসমান বিদ্যালয় কার্যক্রম” চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বর্ষা মৌসুমেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত থাকে।

সংক্ষেপে, অর্ধলাখ শিশু এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত—এ শুধু পরিসংখ্যান নয়, একটি জাতির ভবিষ্যতের সংকেত। শিক্ষা যখনই থেমে যায়, সেখানে থেমে যায় উন্নয়ন, থেমে যায় স্বপ্নও।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

চট্টগ্রাম বিভাগে অর্ধলাখ শিশু এখনো শিক্ষার বাইরে: হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক

Update Time : ০১:০১:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

 

জহির শাহ্, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি | ৯ নভেম্বর ২০২৫

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলায় এখনো প্রায় অর্ধলাখ শিশু কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই তথ্য। অধিদপ্তর বলছে, বিদ্যালয়ের সীমিত সংখ্যা, আর্থিক অক্ষমতা ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বহু শিশুই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকছে।

জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী মোট ৪৬ হাজার ৪৬৪ শিশু কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়নি। এদের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি — ৩৫ শতাংশেরও বেশি শিশু — রয়েছে হাওরবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। সংখ্যা হিসেবে যা প্রায় ১৬ হাজার ৩৫৩ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে নোয়াখালী (৬,৭৫৯ জন) এবং চট্টগ্রাম জেলা (৫,৭৫০ জন)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনোত্তর অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও পরিবারের আয় হ্রাস শিক্ষাক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বহু শিশু বিদ্যালয়ের পরিবর্তে পরিবারের জীবিকার অংশ হয়ে পড়ছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বিদ্যালয়ে শিশুভর্তির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২০ সালের তুলনায় এখন শিশুভর্তির হার অন্তত ২ শতাংশ কমেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ের আর্থিক সংকট, বেকারত্ব, এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস শিশুদের বিদ্যালয় বিমুখ করছে।

হাওরের কারণে পিছিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বণিক বলেন, “হাওর এলাকায় দীর্ঘ সময় পানিবন্দি থাকার কারণে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি এবং ভর্তি—দুটিই ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নাসিরনগরের দুই ইউনিয়ন প্রায় বছরজুড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার সুষ্ঠু কার্যক্রম চালানো কঠিন।”

তিনি জানান, জেলায় হাওরাঞ্চলে অবস্থিত ২২টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে পারে না। “এই অবস্থায় বিকল্প শিক্ষা উদ্যোগ—যেমন মোবাইল স্কুল বা স্যাটেলাইট ক্লাসরুম চালু করা না গেলে শতভাগ ভর্তির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়,” বলেন তিনি।

অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আতাউর রহমান জানান, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনতে স্যাটেলাইট স্কুল, অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র ও দূরশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই প্রতিটি শিশুই অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত বিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে অংশ নিক। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।”

চট্টগ্রাম শহরের বাস্তবতা
চট্টগ্রামের উপকূল ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও শিক্ষাবিমুখতার চিত্র উদ্বেগজনক। নগরীর কর্ণফুলী নদীপাড়ের শুকনো মাছ পল্লীতে কাজ করে ১২ বছর বয়সী মোকলেস। কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে আসা এই কিশোরের পরিবারের পক্ষে তার বিদ্যালয়ে পাঠানোর সামর্থ্য নেই। সে এখন মাসে সাত হাজার টাকায় শ্রম বিক্রি করছে।

কালুরঘাট এলাকার খাবারের দোকানে কাজ করছে ১০ বছরের সুমন মিয়া। তার বাবা বলেন, “পেটে ভাত দিতে পারলেই কৃতজ্ঞ থাকি, স্কুলের চিন্তা করার অবকাশ নেই।”

সংখ্যার পেছনের চিত্র
চট্টগ্রাম বিভাগের ১১০টি উপজেলায় মোট বিদ্যালয়গম্য শিশুর সংখ্যা ৪০ লাখ ৫৪ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার ৯৭৮ জন — ভর্তির হার ৯৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে ৫৯ হাজার ৯২৮ শিশু ভর্তি হয়েও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে, যার হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু রয়েছে চট্টগ্রাম জেলায় (৩,২৯৮ জন), আর সবচেয়ে কম রাঙ্গামাটিতে (১৫২ জন)।

শিক্ষাবিদদের মতামত
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার শুধু সরকারি উদ্যোগে নয়, বরং সমাজের সচেতনতা ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সহযোগিতাতেও নির্ভরশীল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত শিক্ষাকে শুধুই আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘জীবনযাত্রা-নির্ভর শিক্ষা’ হিসেবে দেখা। পরিবারগুলোকে বোঝাতে হবে— বিদ্যালয় শিশুদের বোঝা নয়, বরং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।”

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী বছর থেকেই হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে “ভাসমান বিদ্যালয় কার্যক্রম” চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বর্ষা মৌসুমেও শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত থাকে।

সংক্ষেপে, অর্ধলাখ শিশু এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত—এ শুধু পরিসংখ্যান নয়, একটি জাতির ভবিষ্যতের সংকেত। শিক্ষা যখনই থেমে যায়, সেখানে থেমে যায় উন্নয়ন, থেমে যায় স্বপ্নও।