খিলগাঁও ফ্লাইওভারে প্রাণ গেল ক্রীড়া সাংবাদিক জহিরের
- Update Time : ১০:৫৯:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ৩০ Time View
জহির শাহ্ , ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি , ১ নভেম্বর ২০২৫
রাজধানীর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের বাসাবোমুখী ঢালুতে রোববার (৩০ নভেম্বর) বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিট থেকে ৩টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার অন্যতম পরিচিত মুখ, দৈনিক ভোরের পাতার জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া প্রতিবেদক জহির উদ্দিন ভূঁইয়া (৫৩)। কারওয়ান বাজারের অফিস থেকে বাসাবোর বাসায় ফেরার পথে তাঁর মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো-এএ-০৮-১৫০৪) হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফ্লাইওভারের মাঝের আইল্যান্ডে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা খায়। স্থানীয় পথচারী ও রিকশাচালকরা তৎক্ষণাৎ তাঁকে উদ্ধার করে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও একাধিক হাড় ভাঙাকে মৃত্যুর কারণ ধরা হয়েছে; ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও আসেনি।
নিহত জহির উদ্দিন ভূঁইয়া ১৯৭২ সালে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার চাপিতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মো. শামসুদ্দিন ভূঁইয়া। রাজধানীর সবুজবাগ থানার বাসাবো এলাকায় স্ত্রী রেহানা বেগম ও একমাত্র ছেলে রাকিব উদ্দিন ভূঁইয়া তামিম (২৮) নিয়ে বসবাস করতেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় নিবেদিত জহির ভূঁইয়া ২০০০-এর শুরুতে দৈনিক মানবজমিন দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন, পরে দীর্ঘ সময় দৈনিক ভোরের পাতায় জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন। ক্রিকেট ছিল তাঁর প্রধান বিট—২০০৫ সালে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় থেকে শুরু করে সবকটি বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ, আইপিএল, বিপিএলের প্রতিটি আসর তিনি কভার করেছেন। ফুটবল, কাবাডি, ভলিবলসহ দেশীয় খেলাধুলাতেও ছিল তাঁর সমান দখল। রায়পুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হিসেবে তিনি জুনিয়র সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য বীমা স্কিম ও স্থানীয় ক্রীড়া উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। সহকর্মীদের কাছে “জহির ভাই” বা “পদু কী খাবি বল” ডাকের এই মানুষটি ছিলেন সিনিয়র-জুনিয়র সবার অভিভাবক।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্রীড়াঙ্গন ও গণমাধ্যমে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিপিএল নিলাম চলাকালীন এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, বাফুফে, বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়ন, ক্রীড়া লেখক সমিতি, ভোরের পাতা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করেছে। সাবেক ক্রিকেটাররা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “জহির ভাইয়ের প্রশ্নের সামনে কোনো খেলোয়াড়ই পার পেত না, তাঁর রিপোর্টিং ছিল নির্মোহ ও গভীর।” সহকর্মীরা বলছেন, “আমাদের দলের মাঝখান থেকে হঠাৎ একজন বড় ভাই চলে গেলেন, এ শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না।”
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় অন্য কোনো যানবাহন জড়িত নয়। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ফ্লাইওভারের তীব্র ঢাল, পিচ্ছিল রাস্তা ও গতির সমস্যা উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি ২০২৫ সালে খিলগাঁও ফ্লাইওভারে ঘটা ষষ্ঠ মারাত্মক দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এই ফ্লাইওভারের ঢালে অতিরিক্ত গতিতে ব্রেক ফেল করার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব নিয়ে সতর্ক করছেন।
সোমবার বাদ আসর বাসাবো জামে মসজিদে প্রথম জানাজা এবং পরে কুমিল্লার মুরাদনগরে গ্রামের বাড়িতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে বলে পরিবার জানিয়েছে।
দেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের এভাবে চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো ক্রীড়াঙ্গন ও গণমাধ্যমকে শোকাহত করেছে। জহির ভূঁইয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন লাখো পাঠক, সহকর্মী ও ক্রীড়া প্রেমীরা।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।













